বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪:৫৩ পূর্বাহ্ন

লালমনিরহাটের নিভৃত গ্রামে নরওয়ের রাষ্ট্রদূত

জিন্নাতুল ইসলাম জিন্না, লালমনিরহাট প্রতিনিধি।। ‎​শহরের যান্ত্রিক কোলাহল পেরিয়ে লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার নিভৃত গ্রাম দেওডোবা। এখানকার একটি মেঠো উঠানে বসে চলছে শিশুদের লোকসংগীত ও দেশীয় বাদ্যযন্ত্রের সুরের সাধনা। কারও ছোট আঙুলে বাজছে দোতারা, কারও হাতে একতারা। এসব বাদ্যযন্ত্রে বাতাসে ভেসে আসছে ভাওয়াইয়া, লালন, বাউল, মুর্শিদী কিংবা মারফতি গানের মরমি সুর। শেকড়সন্ধানী এই শিশুদের গানের টানেই সুদূর নরওয়ে থেকে ছুটে এসে আদিতমারীর এই গ্রামীণ সাংস্কৃতিক পরিসরে দাঁড়িয়ে মুগ্ধতা প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত নরওয়ের রাষ্ট্রদূত হাকন আরাল্ড গুলব্রান্ডসেন।

‎​সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) বিকেলে লালমনিরহাটের আদিতমারীতে প্রতিষ্ঠিত স্থানীয় সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘মায়ের তরী’র কার্যক্রম পরিদর্শন করেন তিনি। এ সময় রাষ্ট্রদূত শিশুদের লোকসংগীত চর্চা, লোকবাদ্যযন্ত্রের প্রশিক্ষণ এবং সংগঠনটির সামগ্রিক কর্মকাণ্ড ঘুরে দেখেন।

‎​পরিদর্শনকালে নরওয়ের রাষ্ট্রদূত হাকন আরাল্ড গুলব্রান্ডসেন বলেন, বাংলাদেশের সমৃদ্ধ লোকসংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখতে এ ধরনের উদ্যোগ অত্যন্ত প্রশংসনীয় ও সময়োপযোগী। দীর্ঘ এক দশক ধরে ‘মায়ের তরী’ নীরবে যে কাজ করে যাচ্ছে, তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ সময় তিনি সংগঠনটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবাইকে ধন্যবাদ জানান।একই সঙ্গে ‘মায়ের তরী’র প্রতিষ্ঠার অন্যতম কারিগর নরওয়ের নাগরিক, লেখক, লোকগবেষক, আলোকচিত্রী ও কবি মিস উয়েরা সেথের-এর অবদানের কথা গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন।

‎​রাষ্ট্রদূত আরও বলেন, লোকসংগীত ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য কেবল কোনো দেশের অতীতকে ধারণ করে না, এটি মানুষে মানুষে হৃদয়ের বন্ধন তৈরিরও একটি শক্তিশালী মাধ্যম। ‘মায়ের তরী’র কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর শিশুরা সংস্কৃতির আলো পাচ্ছে। একই সঙ্গে স্থানীয় ঐতিহ্য ও লোকবাদ্যযন্ত্রের ধারাগুলো নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। সংস্কৃতি ভিন্ন দেশের মানুষকে কাছাকাছি আনতে এবং সীমান্ত পেরিয়ে মেলবন্ধন তৈরিতে অনন্য ভূমিকা রাখে।

‎​এ সময় অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন, নরওয়ে দূতাবাসের ডেপুটি হেড অব মিশন আলেকজান্ডার ফাল্ক-বিল্ডেন, প্রোগ্রাম অফিসার শাহপার সেলিম, আদিতমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা গুঞ্জন বিশ্বাস, স্ট্রমী ফাউন্ডেশনের কান্ট্রি ডিরেক্টর মিজানুর রহমান, ‘মায়ের তরী’র সভাপতি প্রমোদ চন্দ্র বর্মণ, নির্বাহী পরিচালক সুজন কুমার বেদ, উপদেষ্টা পিন্টু সাহা এবং সংগঠনের অন্যতম সংগঠক ইউসুফ আলমগীরসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ।

‎​সংগঠন সূত্রে জানা যায়, ‘মায়ের তরী’র মূল কার্যালয় লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার দেওডোবা গ্রামে অবস্থিত। বর্তমানে লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রাম জেলায় সংগঠনটির উদ্যোগে নয়টি ‘গুরুগৃহ’ পরিচালিত হচ্ছে। এসব গুরুগৃহে ছয় শতাধিক শিশু সম্পূর্ণ বিনা খরচে লোকসংগীত ও লোকবাদ্যযন্ত্রের তালিম নিচ্ছে। এছাড়া দুটি লোকবাদ্যযন্ত্র প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে প্রায় ১২৫ জন শিক্ষার্থী বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্রের প্রশিক্ষণ পাচ্ছে এবং বিশেষ ক্লাসের মাধ্যমে ৩০ জন শিক্ষার্থী নিয়মিত লোকসংগীতের বিভিন্ন ধারা নিয়ে গভীর জ্ঞান অর্জন করছে।

‎​প্রত্যেক গুরুগৃহের গুরু নিজ নিজ বাড়িতে শিশুদের প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকেন। তবলার ছন্দ, দোতারা ও একতারার সুরে শিশুরা লালন, বাউল, মুর্শিদী, মারফতি, ভাওয়াইয়া ও পল্লিগানের পাশাপাশি বেহালা, বাঁশি, খমক ও সারিন্দার মতো হারিয়ে যেতে বসা লোকবাদ্যযন্ত্রের চর্চা করছে। ‎​তবে নানামুখী সাফল্যের মধ্যেও সংগঠনটির বড় চ্যালেঞ্জ হলো আর্থিক সীমাবদ্ধতা। প্রত্যন্ত অঞ্চলে শিশুদের গান শেখানো বেশিরভাগ গুরু প্রায় স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করছেন। অনেক ক্ষেত্রেই নিশ্চিত পারিশ্রমিক না থাকলেও লোকসংস্কৃতির প্রতি নিখাদ দায়বদ্ধতা থেকে তাঁরা এই কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। এছাড়া প্রবীণ লোকশিল্পীদের গান ও সুর ডিজিটাল মাধ্যমে সংরক্ষণের জন্য একটি আধুনিক রেকর্ডিং স্টুডিও এবং ডিজিটাল আর্কাইভ গড়ে তোলার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

‎​‘মায়ের তরী’র নির্বাহী পরিচালক সুজন কুমার বেদ জানান, আগামী দিনে প্রবীণ লোকসংস্কৃতিসেবীদের জন্য সম্মান ও নিরাপত্তার আপন ঠিকানা এবং লোকসংস্কৃতির বিশেষ চর্চা ও গবেষণার জন্য একটি কেন্দ্র গড়ে তোলার প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। প্রান্তিক এই শিশুদের কণ্ঠে বাংলার লোকসংগীত টিকিয়ে রাখতে সরকারি-বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা বাড়ানো হলে এই ঐতিহ্য আরও সুদৃঢ় হবে বলে মনে করছেন স্থানীয় সুধীসমাজ।

সংবাদটি শেয়ার করুন

© All rights reserved © 2024  Ekusharkantho.com
Technical Helped by Curlhost.com